জেনে নিন মহিলাদের হাড়ক্ষয়ের আসল কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধে উপায়

বয়সের সাথে সাথে হাড় ক্ষয় একটি অবধারিত বিষয়। বিশেষ করে মহিলাদের শরীরে ক্যালসিয়াম এর ঘাটতি এবং হাড় ক্ষয়ের সম্ভাবনা পুরুষ দের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। এর কারন গর্ভধারন জনিত এবং এর পরবর্তীতে বাচ্চার মাতৃদুগ্ধ পানকালীন সময়ে ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি এর চাহিদা বেশি থাকে। এরপর মেনোপজের সময়ে এস্ট্রজেন হরমনের অভাবে শরীরে ক্যালসিয়ামের শোষণ কমে যায়, ফলে এসময়ে খুব দ্রুত হাড় ক্ষয় হতে থাকে।

এছাড়া আর যেসব কারনে ক্যালসিয়াম এর অভাব হতে পারে তা হচ্ছে:

১. ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার পরিমানে কম গ্রহন করা।

২. পর্যাপ্ত শরীর চর্চার অভাব(weight bearing exercise)।

৩. অলসতা পুর্ন জীবন যাপন।

৪. কিছু ওষুধ যেমন, ডাই-ইউরেটিক্স, হেপারিন, জন্মনিয়ন্ত্রণ এর ইঞ্জেকশন (DMPA) দীর্ঘদিন ব্যাবহার করলে হাড় ক্ষয়ের মাত্রা বেড়ে যায়।

৫. হাইপো প্যারাথাইরয়েডিজম, কিডনি ড্যামেজ।

৬. অ্যালকোহল, ধুমপান ইত্যাদি।

শরীরে প্রয়োজনীয় এই মিনারেলের অভাবে হাড়ক্ষয় (Osteoporosis, Osteopenia) ছাড়াও যে সমস্যাগুলো হতে পারে তা হচ্ছে:

১. খিচুনি।

২. মাসেল ক্রাম্প।

৩. অবশতা।

৪. হাই ব্লাড প্রেসার।

৫. ডিপ্রেশন।

৬. ঘুমের সমস্যা।

৭. দুর্বলতা ইত্যাদি।

সমাধান:

১. পর্যাপ্ত পরিমানে ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবার গ্রহন করা, যেমন- দুধ, পনির,চিজ বা অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার, বাদাম, ব্রকলি, সবুজ শাক- সবজি ইত্যাদি।

২. নিয়মিত এক্সারসাইজ এবং দীর্ঘসময় শুয়ে- বসে থাকা পরিহার করা।

৩. প্রেগনেন্সি এবং ল্যাক্টেশনের সময় প্রতিদিন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী Calcium+Vit-D ট্যাবলেট গ্রহন।

৪. বয়স চল্লিশের পর অথবা অন্যান্য রিস্ক ফ্যাক্টর থাকলে Calcium ও vit- D supplementation নেয়া।

ডা: নুসরাত জাহান

সহযোগী অধ্যাপক, গাইনী বিভাগ,
ডেলটা মেডিকেল কলেজ,মিরপুর, ঢাকা।

মহিলাদের হাড়ের ক্ষয় কেন বেশি হয়ঃ

হাড়ের ভিতরের ঘনত্ব বাড়াকমা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত হাড়ের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ২০ বছর বয়স পর্যন্ত হাড়ের ভিতরের গঠন ও ক্ষয় একই গতিতে চলতে থাকে। বয়স ৪০ বছর পার হলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হারের ক্ষয়ের মাত্রা একটু একটু করে বাড়তে থাকে। পুরুষের তুলনায় মহিলারা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে মহিলাদের মেনোপজ বা ঋতুস্রাব বন্ধের পর শরীরে ইস্ট্রোপেন নামক হরমোন কমে যায়। ফলে হারের ক্ষয়ের মাত্রা বেড়ে যায়।

কি কি কারণে এমন হয়?

♦ মেনোপজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া।

♦ পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম না করা।

♦ পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি গ্রহণ না করা।

♦ শরীরে ওজন (বি এম আই অনুযায়ী অতিরিক্ত কম হলে)।

♦ অতিরিক্ত ধূমপান বা এলকোহল পান। তাছাড়া কিছু কিছু অসুখে হাড় ক্ষয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যেমন—

♦ শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে গেলে

♦ শরীরে থাইরয়েড বা প্যারালাইরয়েড হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে।

♦ যে রোগে খাবার শোষণ ব্যাহত হয় যেমন- সিলিয়াজ ডিভিজ, ক্রনস ডিজিজ।

যে সব রোগে দীর্ঘদিন শুয়ে থাকতে হয়, হাঁটাচলা করতে পারে না, সেক্ষেত্রে হারের ক্ষয় বেশি হয়। যেমন- ব্রেন স্ট্রোক, এম আই ভি, স্তন ক্যান্সার ইত্যাদি। তাছাড়া কিছু ঔষধ ও হাড়ের ক্ষয় বাড়িয়ে দেয়। যেমন- কটিকেস্টেরয়েড, খিঁচুনি বিরোধী ঔষধ ক্যান্সার চিকিৎসায় ব্যবহূত ঔষধ।

হাড় ক্ষয়ের লক্ষণ কী

যেহেতু বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাড় ক্ষয় একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। কিন্তু হাড়ের ভিতরের উপাদান বা ত্বক অধিক পরিমাণ কমে গেলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়। যেমন- সারা শরীরে ব্যথা অনুভূত হয়। বেশিক্ষণ হাঁটাহাঁটি বা চলাচল করতে কষ্ট হয়। শরীরে ভারসাম্য কমে যায়। যার ফলে পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। আত্মবিশ্বাস বা মনোবল কমে যায়। এই কারণে মাহিলাদের হিপ ফ্যাকচার বেশি দেখা যায়।

হাড় ক্ষয় নির্ণয় করবেন কীভাবে

হাড়ের ক্ষয় রোগ সহজেই নির্ণয় করা যায়। চিকিৎসক রোগীর ক্লিনিক্যাল উপসর্গ পর্যবেক্ষণ, রোগীর বয়স, পূর্ববর্তী রোগ ও ওষধের হাড়ের এক্স-রে ও বি এস ডি (বোন মিনারেল ডেনসিটি) পরীক্ষার মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব নির্ণয় করা যায়।

হাড় ক্ষয় প্রতিরোধ করণীয়

♦ সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা। প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা। যেমন- ননী তোলা দুধ, কম স্নেহজাতীয় দই, কডলিভার ওয়েল।

♦ নিয়মিত শরীর চর্চা ও ব্যায়াম করা।

♦ ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ করুন।

♦ পতন বা পড়ে যাওয়া বোধ করুন।

♦ পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলাদের হাড়ের ঘনত্ব নির্ণয় করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

হাড় ক্ষয়ের চিকিৎসা

চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো আপনার হাড়কে শক্তিশালী করে তোলা, হাড় ক্ষয়ের হার কমানো সর্বোপরি হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমানো। এই চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহূত হয়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

এলেন্ডানেট সোডিয়াম, রিমোড্রোনেট সোডিয়াম, ইবানড্রেনিক অ্যাসিড, জলিবিক অ্যাসিড, হরমোনের সমস্যা থাকলে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সালিলেন্ট।

চিকিৎসা না করলে পরিণতি

হাড় ক্ষয় প্রাথমিক অবস্থায় তেমন উপসর্গ থাকে না, তখনই যন্ত্রণাদায়ক হয় যখন হাড়ে ফাটল ধরে বা হাড় ভেঙে যায়। হাড় ক্ষয়ের ফলে হাড়ের ঘনত্ব কষে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। ফলে সামান্য আঘাত লাগলে কিংবা পড়ে গেলে এমনকি দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজ করতে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গার হাড় ভেঙে যেতে পারে।

ডা. এম ইয়াছিন আলী
ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ,

চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালটেন্ট,
ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।

৫০০০+ মজদার রেসিপির জন্য Google Play store থেকে Install করুন “রান্না-বান্না& Recipes” মোবাইল app…. 🙂
.
মোবাইল app Download Link >>> http://bit.ly/32lhMSV

Loading...